আচমকাই বদলে গেল আবহাওয়া। ডেউচা পাচামি প্রকল্পের উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীকে নিমন্ত্রণ করে ‘ফিল গুড’-এর বাতাস বওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা কাটল না, অনিশ্চিত হয়ে পড়ল প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা তৃণমূলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুতর সংশয় প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি পাঠালেন এক বিজেপি সাংসদ। নেতৃত্বের অনুমোদন তথা নির্দেশেই এই চিঠি। অতএব মমতার এই নিমন্ত্রণে আদৌ সাড়া দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে মোদীর দফতর।

বুধবার প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরোনোর পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছিলেন যে, বীরভূমের ডেউচা পাচামিতে কয়লা ব্লক প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পুজো মিটলে এই অনুষ্ঠান তিনি করতে চান বলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দিল্লিতে জানান। মমতার নিমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন বা ওই কয়লা ব্লক প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির থাকার বিষয়ে সম্মতি দিয়ে দিয়েছেন, এমন কোনও খবর ছিল না। বিষয়টা প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনাধীনই ছিল। অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনা মতোই সব কিছু এগোবে, এই রকম নিশ্চয়তা ছিল না। সেই অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে গেল প্রধানমন্ত্রীকে বিজেপি সাংসদ স্বপন দাশগুপ্তর লেখা চিঠিতে। রাজ্যসভার ওই বিজেপি সদস্য বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখে সংশয় প্রকাশ করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে।

‘‘আমার মনে হয়, দুর্গাপুজোর পরে ওই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে আপনার উপস্থিতি সব রকমের ভুল বার্তা দিতে পারে।’’ প্রধানমন্ত্রীকে এই কথাই লিখেছেন স্বপন দাশগুপ্ত। ডেউচা পাচামি কয়লা ব্লক প্রকল্পের উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী হাজির হলে ‘ভুল বার্তা’ যাবে বলে কেন মনে করছে বিজেপি? স্বপন দাশগুপ্তর চিঠিতে সেই ব্যাখ্যাও রয়েছে বিশদে। দু’পাতার চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ডেউচা পাচামি প্রকল্পের পরিকল্পনা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এই প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব কেমন হতে চলেছে, তা এখনও খতিয়ে দেখাই হয়নি। পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে স্বপনবাবু আরও জানিয়েছেন, যে এলাকায় এই কয়লা পাওয়া গিয়েছে, সেটি আদিবাসী প্রধান। গত কয়েক বছর ধরেই সেই আদিবাসীরা এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। আদিবাসীদের তথা ওই এলাকার বাসিন্দাদের উপযুক্ত পুনর্বাসন দেওয়ার পরিকল্পনা বা নীতিও যে এখনও তৈরি হয়নি, সে কথা পশ্চিমবঙ্গ সরকারই স্বীকার করেছে বলে স্বপন লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীকে।

আরও পড়ুন:কেমন চলছে হাঁটা? ঘরে ঢুকতেই দিদির কাছে জানতে চাইলেন মোদী
আরও পড়ুন: ডেউচার উদ্বোধনে রাজ্যে মমতার ডাক মোদীকে

এর পাশাপাশি বীরভূমের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও স্বপন দাশগুপ্ত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। তিনি লিখেছেন, ‘‘সম্প্রতি বীরভূম জেলা রাজনৈতিক হিংসার গ্রাসে চলে গিয়েছে। এবং পুলিশি অত্যাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জমি হাঙররাই এই হিংসার কারিগর বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।’’ এই সব কথা মাথায় রেখেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিমন্ত্রণ স্বীকার করার আগে ভাল ভাবে পরিস্থিতি বিচার করা উচিত প্রধানমন্ত্রীর, আর্জি স্বপনের। পরিবেশ মন্ত্রক এবং অন্যান্য বিভাগ থেকে প্রকল্পটি জরুরি ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী যদি তার উদ্বোধনে হাজির হন, তাহলে ভুল ধারণা তৈরি হবে বলে বিজেপি সাংসদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে তড়িঘড়ি ওই প্রকল্পের উদ্বোধনে হাজির করে আসলে পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র এবং এলাকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত জটিলতা এক ধাক্কায় নিজেদের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার—চিঠিতে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বপন।

আনন্দবাজারকে স্বপনবাবু বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি প্রধানমন্ত্রীকে বোকা বানাতে চাইছেন? যে প্রকল্পটা এখনও অধিকাংশ ছাড়পত্রই পায়নি, যে প্রকল্পটার পরিকল্পনাই এখনও রাজ্য সরকার চূড়ান্ত করতে পারেনি, তার উদ্বোধন নিয়ে হঠাৎ এত তাড়াহুড়ো কেন?’’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্য নিয়ে বিজেপি যথেষ্ট সংশয়ে রয়েছে বলে স্বপনবাবু খোলাখুলি জানিয়েছেন। একবার প্রধানমন্ত্রীকে ওই প্রকল্পের উদ্বোধনে হাজির করে দিতে পারলেই পরবর্তী কালে যাবতীয় ক্ষোভ-বিক্ষোভের দায় কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে তথা বিজেপির দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গ সরকার করবে বলে বিজেপি নেতারা মনে করছেন।

পড়ুন সেই চিঠি:

বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় হয়েছে রাজ্য বিজেপিও। আরএসএস-এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাজ্য বিজেপির কয়েকজন ইতিমধ্যেই কথা বলেছেন বলে খবর। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যুবনেতা শঙ্কুদেব পণ্ডাও। বিজেপির তরফ থেকে স্বপন দাশগুপ্ত যেমন উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে, তেমনই সঙ্ঘের মাধ্যমেও এই উদ্বেগের কথা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গিয়েছে। শঙ্কুদেব বলেন, ‘‘একটা দেউলিয়া হয়ে যাওয়া সরকার সংকীর্ণ স্বার্থে ডেউচা পাচামি প্রকল্পকে ব্যবহার করতে চায়। তাই সঙ্ঘ নেতৃত্বের কাছে আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। কী ধরনের ‘সংকীর্ণ স্বার্থ’? যুব নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘টাকার অভাবে রাজ্য সরকারের দান খয়রাতি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ডেউচা পাচামির মতো বিরাট কয়লা ব্লককে লুঠ করে সরকার এখন টাকা রোজগার করতে চায় এবং তার পরে সেই টাকা বিধানসভা ভোটের আগে বিলি করতে চায়। আমরা সেটা হতে দেব না।’’

শুধু সরকারের দিকে আঙুল তুলেই থামছেন না বিজেপি নেতারা। তড়িঘড়ি ডেউচা পাচামি প্রকল্প চালু করে তৃণমূলও ‘তোলাবাজি’র নতুন রাস্তা খুলতে চাইছে বলে বিজেপি নেতাদের দাবি। বরাত পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এবং জমি হাঙরদের ময়দানে নামিয়ে দলের তহবিলে তৃণমূল বিপুল টাকা ভরতে চায় এবং সেই টাকা পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে খরচ করতে চায় বলে বিজেপির দাবি। সেই পথ তৃণমূলের সামনে কিছুতেই খুলে দিতে চায় না গেরুয়া শিবির। সেই কারণেই মোদী-মমতা বৈঠকের পরের দিনই প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন স্বপন দাশগুপ্ত।রাজ্য বিজেপির নেতারা যতটা খোলাখুলি ভাবে তৃণমূলের ‘তোলাবাজি’র পরিকল্পনার অভিযোগ তুলছেন, প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে স্বাভাবিক কারণেই ততটা স্পষ্ট করে সেসব কথা তিনি উল্লেখ করেননি। কিন্তু জমি হাঙরদের কথা উল্লেখ করে এবং রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বপন দাশগুপ্ত নিজের ইঙ্গিতটা যথেষ্ঠ স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

এই চিঠি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পৌঁছনোয় ডেউচা পাচামি প্রকল্প নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে যেতে পারে।  কোন কোন ছাড়পত্র পাওয়া বাকি রয়েছ, যাদের উচ্ছেদ করা হবে তাঁদের পুনর্বাসনের বিষয়ে কী নীতি নেওয়া হয়েছে সেসব দিকে এবার কেন্দ্র সতর্ক নজর রাখবে। ফলে পুজোর পরেই ওই প্রকল্পের উদ্বোধন হওয়া কঠিন হয়ে পড়ল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান আরও বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।