কাটমানি-কাণ্ডে সুর আরও চড়াল বিজেপি। মঙ্গলবার কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হলেন বিজেপি নেতারা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির অদূরে দাঁড়িয়ে সায়ন্তন বসুর ঘোষণা, ‘‘সরকার গঠনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কাটমানি খাওয়া নেতাদের জমি-বাড়ি দখল করব।’’ অন্য দিকে লোকসভায় লকেট চট্টোপাধ্যায় বললেন, কাটমানির ৭৫ শতাংশ টাকা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর কাটমানি ফেরতের নিদানের পরেই রাজ্য জুড়ে চলছে বিক্ষোভ, ধর্না। তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের বাড়ি গিয়ে কাটমানি ফেরত চাইছেন ভুক্তভোগীরা। কেউ ফেরত দিচ্ছেন, কেউ ফেরানোর মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পাচ্ছেন। এই কাটমানি ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে আগেই ময়দানে নেমেছিল বিজেপি। এ বার খাস কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির অদূরে অবস্থান-ধর্না করে সেই আন্দোলন আরও জোরদার করল বিজেপি। মঙ্গলবার হাজরা মোড়ে জমায়েত করে প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেখাল গেরুয়া শিবির। ছিলেন রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব।

মঙ্গলবারের ধর্না মঞ্চ থেকেই রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুর হুমকি, ‘‘ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার গঠন করুন। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যাঁরা কাটমানি খেয়েছেন, ৭২ ঘন্টার মধ্যে তাঁদের জমি-বাড়ি আমরা সরকার থেকে দখল করব। সেই সম্পত্তি বিক্রি করে আপনাদের টাকা আমরা ফিরিয়ে দেব।’’

‘জয় শ্রীরাম’ নিয়ে রাজ্য রাজনীতি সরগরম হয়েছিল লোকসভা ভোটের আগে। মেদিনীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান ওঠে। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে তেড়ে গিয়েছিলেন। ভোটের পর ভাটপাড়াতেও প্রায় একই ছবি দেখা যায়। জয় শ্রীরাম স্লোগান দেওয়া নিয়ে শুরু হওয়া অশান্তিতে পুলিশের গুলি চালানোর অভিযোগও উঠেছিল। এ বার কার্যত মুখ্যমন্ত্রীর কালীঘাটের বাসভবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেই স্লোগান তুললেন বিজেপি নেতা-নেত্রীরা। সেই প্রসঙ্গ টেনে এ দিন হাজরা মোড়ের সভা থেকে দলের আর এক রাজ্য সাধারণ সম্পাদক রাজু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘জয় শ্রীরাম বললাম, কারণ এই আওয়াজ দিদির বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে। ক্ষমতা থাকলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ এসে আমাদের উপরে গুলি চালাক।’’ কাটমানি নিয়ে রাজুর তোপ, ‘‘তৃণমূলের লোকেরাইএখন বলছেন, দিদিভাই, যদি ব্যবস্থা নিতে হয়তা হলে আগে নিজের ভাইপোর বিরুদ্ধে তা নিয়ে দেখান। ২৫ শতাংশ কাটমানি উদ্ধারের কাজ মানুষ আজ গ্রামে গ্রামে শুরু করে দিয়েছেন। আগামী দিনে ৭৫ শতাংশ উদ্ধারের জন্য মানুষ কালীঘাটে আর তৃণমূলভবনে যাবেন|’’ একই সঙ্গে তাঁর খোঁচা, ‘সিএম’ মানে এখন চিফ মিনিস্টার নয়, ‘কাট মানি’।

আরও পডু়ন: স্বস্তিতে রাজীব কুমার, গ্রেফতারির উপর ‘রক্ষাকবচ’ বহাল ২২ জুলাই পর্যন্ত

প্রাক্তন আইপিএস ভারতী ঘোষের আক্রমণ ছিল আরও ঝাঁঝালো। মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে সাম্প্রতিক একাধিক প্রসঙ্গ তুলে ভারতীর তোপ, ‘‘মেট্রো ডেয়ারির যে ৪৭ শতাংশ শেয়ার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর এক ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীকে নিয়ম ভেঙে বিক্রি করে দিয়েছেন, তার আসল দাম হয় ৫৩২ কোটি টাকা। কিন্তু আপনি বেচে দিলেন ৮৪ কোটি টাকায়!’’ ভারতীর প্রশ্ন, ‘‘মেট্রো ডেয়ারি থেকে কত টাকা কাটমানি খেলেন দিদিমনি?’’ তিনি বলেন, ‘‘এই সেই মুখ্যমন্ত্রী, যিনি সারদার পর ধর্নায় বসেননি, কিন্তু রাজীব কুমারের জন্য ধর্নায় বসেছিলেন।’’ প্রশান্ত কিশোরের প্রসঙ্গ টেনেও এ দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খোঁচা দেন ভারতী। তিনি বলেন,‘‘প্রশান্ত কিশোরকে ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে এনেছেন। ওই ৪০০ কোটি আমাদের থেকে নেওয়া কাটমানির টাকা। আমাদের ক্ষমতায় আসতে দিন, ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে ওই কাটমনির হিসেব নেব।’’ রাজু-সায়ন্তনরা ছাড়াও এ দিনের সভায় ছিলেন রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার, বাদশা আলম, রাজকমল পাঠক প্রমুখ। 

আরও পড়ুন: ইসকনের রথযাত্রায় এ বার বিশেষ অতিথি নুসরত

দলের রাজ্য নেতারা যখন হাজরা মোড়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়াচ্ছেন, দিল্লিতে তখন সংসদে কাটমানি নিয়ে সরব দলের হুগলির সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়। লোকসভায় তিনি বলেন, ‘‘শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন হাসপাতালের বেড ভাড়া থেকে শুরু হয় কাটমানি নেওয়া। আবার শ্মশানে যখন কোনও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার শেষকৃত্য হয়, তখনও কাটমানি নেওয়া হয়। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কাটমানি নেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গে। মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করে নিয়েছেন যে, কাটমানি নেওয়া হচ্ছে। সেই জন্য কাটমানি ফেরত দাও। নিচুতলা থেকে উপর মহলে মন্ত্রী পর্যন্ত এই কাটমানিতে জড়িত। আজ যাঁরা চোর, তাঁরাই বলছেন চুরির বিচার চাই।’’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে লকেট এ দিন আরও বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ২৫ শতাংশ রেখে দাও, আর ৭৫ শতাংশ আমাকে দাও। তার মানে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ৭৫ শতাংশ টাকা আছে। এই কাটমানির টাকা কোথায়। তৃণমূল সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের লড়াই চলছে। এর উত্তর তৃণমূল সুপ্রিমোকে দিতে হবে।’’