পশ্চিমবঙ্গের সবক’টি বিরোধী দলের তীব্র কটাক্ষের আবহে আজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা ছাড়ার সময়ে জানিয়ে গিয়েছেন, রাজ্যের কিছু পাওনার বিষয়ে কথা বলবেন। কিন্তু বাম-কংগ্রেস তো বটেই, প্রধানমন্ত্রীর নিজের দল বিজেপি-ও বলতে শুরু করেছে, বৈঠকের আসল লক্ষ্য পাওনাগন্ডা বুঝে নেওয়া নয়, লক্ষ্য রাজীব কুমারের গ্রেফতারি রোখা। লোকসভা ভোটের আগে যাঁর ফোন পর্যন্ত ধরছিলেন না মমতা, তাঁর সঙ্গেই বৈঠক করতে এখন আচমকা দিল্লি ছুটলেন, তা-ও আবার এত কটাক্ষ সহ্য করে! রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে অতএব জল্পনা জোরদার।

মাত্র দিন পাঁচেক আগের কথা। নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে এই ১৩ সেপ্টেম্বরও তীব্র আক্রমণ করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে সে দিন মোদী সরকারের প্রবল সমালোচনা করেছিলেন নিজের দলের সরকারি কর্মী সংগঠনের সমাবেশে দাঁড়িয়ে। ১৫ সেপ্টেম্বর ফের আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। এ বার টুইটারে। দেশে ‘সুপার ইমার্জেন্সি’ চলছে বলে অভিযোগ করেন সে দিন। কিন্তু ঠিক তার পরের দিনই জানা যায়, মোদীর সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছিলেন মমতা এবং ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মোদী সময়ও দিয়েছেন।

গতকাল অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি পৌঁছেছেন। তবে আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছিল তার আগের দিন অর্থাৎ সোমবার থেকেই। নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি যাচ্ছেন— এই খবর নবান্ন সূত্রে প্রকাশিত হতেই রাজ্যের রাজনৈতিক শিবিরে হইচই শুরু হয়ে যায়। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র থেকে লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী, রাজ্য সিপিএমের সামনের সারির মুখ সুজন চক্রবর্তী বা শমীক লাহিড়ি থেকে সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম— প্রত্যেকে আক্রমণ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রাজ্যের গোয়েন্দা প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রীর প্রিয়পাত্র হিসেবে পরিচিত রাজীব কুমারকে সিবিআই গ্রেফতার করার তোড়জোড় শুরু করতেই আচমকা ‘উন্নয়নের’ কথা মনে পড়েছে মমতার এবং সব ভুলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে ছুটে যাচ্ছেন দিল্লি— এই সুরেই কটাক্ষ ছুড়ে দেন কংগ্রেস ও সিপিএমের নেতারা।

আরও পড়ুন:‘যাচ্ছি রাজ্যের পাওনার ব্যাপারে’, আজ দিল্লিতে মোদীর সঙ্গে বৈঠকের আগে বলে গেলেন মমতা

রাজ্য বিজেপির সুরও কিন্তু মিলে যায় বাম-কংগ্রেসের কটাক্ষের সঙ্গে। দলের জাতীয় কর্মসমিতির সদস্য মুকুল রায় হন বা জাতীয় সম্পাদক রাহুল সিংহ, প্রত্যেকেই বলতে শুরু করেন— রাজীব কুমারের গ্রেফতারি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে এ বার প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এ ভাবে শেষ রক্ষা হবে না বলেও তাঁরা মন্তব্য করতে শুরু করেন।

সারদা কাণ্ডের তদন্তে রাজ্য সরকার যে সিট গঠন করেছিল, রাজীব কুমার তার প্রধান ছিলেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তদন্তের ভার হাতে নেয় সিবিআই এবং রাজীব কুমারের ভূমিকা সম্পর্কেই সিবিআই সন্দিহান হয়ে পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বার বার ডাকা সত্ত্বেও রাজীব কুমার সিবিআই দফতরে হাজিরা দিতে না চাওয়ায় সেই সন্দেহ আরও বাড়ে। এ বার রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির তোড়জোড়ও শুরু করেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি। এবং সেই পরিস্থিতির মাঝেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সময় চেয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। পরিস্থিতি ‘ম্যানেজ’ করার জন্যই এই বৈঠক— এমন অভিযোগ যদি কেউ তোলেন, তা হলে আঙুল প্রধানমন্ত্রীর দিকেও ওঠে। তাই বিজেপির পক্ষে এই অভিযোগ তোলা কঠিন ছিল। কিন্তু বিজেপি সেই পথেই হাঁটে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলেছিলেন, রাজ্য রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কথা মাথায় রেখেই মমতা-বিরোধিতায় কংগ্রেস ও বামেদের সুরে সুর মিলিয়েছেন বাংলার বিজেপি নেতারা। কিন্তু পরে সেই ব্যাখ্যাও অচিরেই নস্যাৎ হয়ে যায়। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয়ও একই মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন:জামিন অধরাই রইল রাজীবের, খোঁজ না পেলে গ্রেফতারি আর্জি জানাতে পারে সিবিআই

রাজীব কুমারকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— মন্তব্য করেছেন কৈলাস। রাজীব কুমার একবার গ্রেফতার হয়ে গেলে মমতার অর্ধেক মন্ত্রীকেই সারদা কাণ্ডে জেলে যেতে হবে, তাই মমতা ওঁর গ্রেফতারি রোখার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন— এমনও বলেন কৈলাস।

স্বাভাবিক কারণেই দিল্লিতে পৌঁছে রাজীব কুমার সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সময় দিয়েছেন জানা সত্ত্বেও বিজেপির সর্বভারতীয় নেতারা যে ভাবে কটাক্ষ করতে শুরু করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে, তাতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে অন্য রকম জল্পনা তৈরি হয়েছে। তাঁদের ব্যাখ্যা, প্রথমত, মমতা সময় চাইতেই তাঁকে সময় দিয়ে মোদী সরকার প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, সাংবিধানিক সৌজন্য তথা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কথা যে বিজেপি সব সময় মাথায় রাখে। দ্বিতীয়ত, মমতাকে বেজায় অস্বস্তিতে ফেলে দিতে চেয়েছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ চুপ থেকেছেন। কিন্তু দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ক্রমাগত কটাক্ষ ছুড়তে থেকেছেন। আর মমতা চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।